বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় সাবলেট থাকার জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দেয়ালে বা বিদ্যুতের খুঁটিতে লাগানো টু-লেট লেখা প্লেট দেখ ছিলেন জোবায়ের হোসেন। খুঁজে খুঁজে ছোট একটি বাসার টু-লেট প্লেটে দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরে কল করে জানতে পারলেন স্বামী-স্ত্রী দুজন থাকার জন্য এক কামরার ভাড়া পড়বে সাড়ে তিন হাজার টাকা। সেখানে আরেকটি পরিবার থাকবে। তাদের সঙ্গে গ্যাসের বিল ভাগাভাগি করে দিতে হবে। পানির জন্য কোনো বিল নেই, কিন্তু বিদ্যুৎ খরচের ওপর বিল নির্ভর করবে। সব মিলিয়ে খরচ ৫ হাজার টাকার মধ্যে থাকবে। চোখে-মুখে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেল এই তরুণের।
কথা বলে জানা গেল, ঢাকার মহাখালী ডিওএইচএস এলাকায় একটি সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারীর কাজ করেন জোবায়ের হোসেন। বেতন পান ১৫ হাজার টাকা। তিন মাস ধরে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। এর আগে ১২ হাজার টাকায় কাজ করতেন কলাবাগানের একটি প্রতিষ্ঠানে। নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে বেতন ৩ হাজার টাকা বাড়লেও বর্তমানে সংসার খরচও বেড়েছে। এ কারণে শেওড়া পাড়ার সাবলেট বাসা ছেড়ে মোহাম্মদ পুরের বসিলায় বাসা খুঁজতে শুরু করেছেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ওই এলাকায় থাকতে পারলে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা সাশ্রয় হবে তার।
জোবায়ের হোসেন জানান, শেওড়া পাড়ায় এখন প্রায় সাড়ে ৭ হাজার টাকা খরচ করে স্বামী-স্ত্রী মিলে ছোট একটি বাসায় সাবলেট থাকেন। বসিলায় যে বাসাটি দেখেছেন সেখানে আগামী মাস থেকে থাকবেন ঠিক করেছেন। একটু দূর হয়ে গেলেও মাসে অন্তত এক থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ বাঁচাতে হবে তাকে। কেননা, চাল, ডাল, তেল, চিনির খরচ বেড়েছে। বাস ভাড়া বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজধানীতে টিকে থাকতে পরিশ্রম বাড়াতে হবে তাকে।
স্বল্প আয়ের এই চাকরিজীবী জানান, পড়ালেখা শেষ করে তার গ্রামের এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে ঢাকার কলাবাগানে গত বছর জুনে ১২ হাজার টাকার চাকরি নেন। স্ত্রীসহ এই টাকায় কোনো রকমে চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল। এখন দিন দিন খরচ বাড়ছে। এত দিনে ঘরে কোনো আসবাব না থাকলেও তার স্ত্রী তেমন কিছু বলতেন না। ঢাকায় থাকা এক/দেড় বছর হয়ে যাচ্ছে, ঘরে ড্রেসিং টেবিল, শোকেস কেনার জন্য স্ত্রী আবদার করেন। কিন্তু কিনতে পারেন না। এর মধ্যে আবার সব কিছুর খরচ বেড়েছে। কাঁচা মরিচের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। এ ভাবে যখন যেটার দাম বাড়ে তার বিকল্প খুঁজতে চেষ্টা করেন। চেষ্টা করছেন নিয়মিত পড়ালেখা করে ভালো একটি চাকরি জোগাড় করতে।
জোবায়ের এই প্রতিবেদককে বলেন, দুপুর বেলা অফিসে লাঞ্চের খরচ বাঁচাতে প্রতিদিন হটপটে খাবার নিয়ে আসি। অফিসের বাইরে বাস ভাড়া ছাড়া আর কোনো খরচ করি না। আশায় আছি ভালো একটি চাকরি পেয়ে যাব। বর্তমান প্রতিষ্ঠানে যাতে সামনে বেতন বাড়ে সে জন্যও চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।
এই চাকরিজীবী আরো জানান, গ্রামের বাড়িতে তার মা-বাবাসহ অন্যান্য আত্মীয়রা দাদার রেখে যাওয়া বসত বাড়িতে থাকেন। তার বাবা একটি মিলে চাকরি করতেন। এখন আর চাকরি নেই। বয়সও হয়েছে। গ্রামে এক খণ্ড ধানি জমি পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন তার বাবা। সেই জমি থেকে পাওয়া ধান-চাল দিয়ে মা-বাবার চলে যায়। যে কারণে মা-বাবাকে তেমন কোনো খরচের টাকা পাঠাতে হয় না তাকে।
জোবায়ের বলেন, এখন যে টাকা বেতন পাই তা দিয়ে দুজনের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তান নিয়ে কী ভাবে কী করব, বুঝতে পারছি না। এই সময়ে বাড়তি খরচের সংগতি নেই দেখে কোনো সন্তানও নিচ্ছি না। আরও দুই/তিন বছর পর নেব ঠিক করেছি। তত দিনে আরেকটু বেশি বেতনে অন্য কোথাও চাকরির চেষ্টা করছি।
তিন মাস ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের ওপরে রয়েছে। গত জুলাই মাসে কিছুটা কমলেও মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। কিন্তু প্রকৃত মূল্যস্ফীতি আরও বেশি বলে মনে করেন নিম্ন আয়ের এই যুবক।
তিনি বলেন, দুই/তিন মাস ধরে প্রায় ৫/৬ হাজার টাকা ধার করে সংসার চালাচ্ছি। কিছু কিছু খরচ তো এড়ানো যায় না। মোবাইল ফোনে এখন সবাই ডেটা কেনে, ফেসবুক ব্যবহার করে। অফিসে বসরাও মাঝে মাঝে হওয়াটস অ্যাপে কল করেন। এ ধরনের খরচ বাঁচানোর জন্য মাঝে মাঝে প্যাকেজ অফারের অপেক্ষায় থাকি।
আক্ষেপ করে এই তরুণ বলেন, বাজারে গিয়ে বেছে বেছে কম দামের মাছ-তরকারি কিনতে হচ্ছে। মন চাইলেও অনেক সময় ভালো-মন্দ খাওয়া হয় না। এখন বাসায় ভালো-মন্দ রান্না মানে খিচুড়ি আর ডিম ভুনা বা বয়লার মুরগির ঝোল। পোলাও-মাংস ঈদে বা বিয়ে শাদির অনুষ্ঠান ছাড়া খাওয়া হয় না। বিয়েশাদির অনুষ্ঠানেও যাওয়া তেমন হয় না টাকা খরচের ভয়ে।