বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহণ সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ করর্পোরেশন (বিআরটিসি) এখনও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দখলে রয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে প্রকাশ্যে দুর্নীতি করাসহ তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা লুটের অভিযোগ ছিল তারাই এখন শীর্ষপদে কর্মরত থেকে খুনি হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের পুনর্বাসন করে চলছেন।
তাদের বিরুদ্ধে কোন রকম ব্যাবস্থা না নিয়ে তাদেরকে আরও দুর্নীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা।
সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধানই যখন সরাসরি অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের অবস্থা কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ হওয়া সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা কর্মচারী জড়িত থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান। কিন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম একটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)। যেখানে চেয়ারম্যানই খোদ জড়িয়ে পড়েছেন অনিয়ম-দুর্নীতিতে।
সংস্থাটির ছোট বড় প্রায় সব খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতিতেই নিজেকে এমনভাবে জড়িয়েছেন চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। যেন তিনি চেটেপুটে গিলছেন বিআরটিসিকে।
বদলিবাণিজ্য থেকে শুরু করে স্বজনপ্রীতি, পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা হেন কোনো অভিযোগ নেই যার সাথে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। যা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো রাঁ (শব্দ) হয়নি কোথাও। প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সাধারণত মুখও খুলতে চান না অধঃস্তনরা। তবে বিষয়গুলি অনেকে জানলেও সংস্থার অভ্যন্তরীণ চাপে পড়ার ভয়ে কেউই মুখ খুলতে চাইছেন না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনে (বিআরটিসি) এখনো ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররা। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে লুফে নিচ্ছে ভালো পোষ্টিং। তারা এখনো রয়েছে বহাল তবিয়তে। আর এ সব তথ্য উঠে এসেছে ব্যাপক অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে কল্যাণপুর বাস ডিপোর ম্যানেজার অপারেশন মোঃ শাহরিয়ার বুলবুল। তিনি এক সময় নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা এইচ টি ইমামের নাতি জামাই হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিতেন। সে পরিচয়ে তিনি লুফে নিতেন ভালো ভালো পোষ্টিং। ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগের আমলে তিনি বিআরটিসির নারায়ণগঞ্জ ডিপোসহ সব লোভনীয় জায়গায় পোষ্টিং করিয়ে নিতেন এইচ টি ইমামের পরিচয় দিয়ে। সে সময় বিআরটিসির কোন চেয়ারম্যান তার উপরে উচ্চবাচ্য করার সাহসও পেতেন না। এ ভাবেই তিনি কাটিয়েছেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমল। ৫ আগষ্টের পর বিআরটিসিতে নতুন চেয়ারম্যান আসার সাথে সাথে তিনি মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজের আসনটি পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন। জনশ্রুতি রয়েছে তিনি নাকি বিআরটিসির নতুন চেয়ারম্যানকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা উৎকোচ দিয়ে কল্যানপুর বাস ডিপোর দ্বায়িত্বে রয়েছেন। এবং প্রতি মাসে নতুন চেয়ারম্যান কে মাসোয়ারা বাবদ ২০ লাখ টাকা দিবেন বলেও মৌখিক ভাবে চুক্তি করেছেন। পতিত ফ্যাসিবাদের দোসর মোঃ শাহরিয়ার বুলবুল এখনো এমন পোষ্টিং এ কি করে রয়েছেন এমন প্রশ্ন এখন বিআরটিসির সাধারন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে। এ ব্যাপারে মোঃ শাহরিয়ার বুলবুলের সাথে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
অপর অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ আগষ্টের পর বিআরটিসিতে নতুন চেয়ারম্যান হিসাবে যোগদান করেন অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লা। তিনি যোগদান করার সাথে তোড়জোড় পড়ে যায় বিআরটিসির বিভিন্ন বাস ও ট্রাক ডিপো ইনচার্জ ও বিআরটিসির সর্বত্র। তিনি যোগদানের পরে গুঞ্জন উঠে বদলি বাণিজ্যের।
এ সুযোগকে কাজে লাগাতে ঢাকায় দ্রুত ছুটে আসেন পাবনা বাস ডিপো ইনচার্জ ডিজিএম মনিরুজ্জামান বাবু। তিনি ঢাকায় এসে বিআরটিসির নতুন চেয়ারম্যানের সাথে দেনদরবার করে তাকে ২০ লাখ টাকা উৎকোচ প্রদান করে নিজের আসন পাকাপোক্ত করে নেন। সেই সাথে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা উৎকোচ প্রদান করবেন বলেও বিআরটিসির চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লার সাথে মৌখিক চুক্তি করেন। যার কারনে মনিরুজ্জামান বাবুকে আর পাবনা বাস ডিপো থেকে বদলি হতে হয়নি। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোহার নবাবগঞ্জের এমপি ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার উপদেষ্টা দরবেশ খ্যাত সালমান এফ রহমানের সাথে বাবুর ছিলো দহরমমহরম।
মনিরুজ্জামান বাবু আওয়ামী লীগের আমলে নিজেকে বার বার দরবেশ খ্যাত সালমান এফ রহমানের নিজের লোক বলে পরিচয় দিতেন। সে পরিচয়ে ফ্যাসিস্ট আমলে তিনি বরিশাল বাস ডিপো, নারায়ণগঞ্জ বাস ডিপো, মতিঝিল বাস ডিপো সহ বিভিন্ন ভালো ভালো ডিপোতে পোষ্টিং নিয়েছিলেন। পতিত ফ্যাসিবাদের দোসর মনিরুজ্জামান বাবু বর্তমানে এমন পোষ্টিং কি করে পান এ প্রশ্ন এখন বিআরটিসির সাধারন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মনে। এ ব্যাপারে মনিরুজ্জামান বাবুর সাথে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যানের পোষ্টিং বাণিজ্য : ৫ আগষ্টের পরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান হিসাবে যোগদান করেন অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লা। তিনি বিআরটিসিতে যোগদান করার পর পরই শুরু করেন বদলি বাণিজ্য। তিনি বিআরটিসির সকল বাস ডিপো, ট্রাক ডিপো ও ট্রেনিং সেন্টারের কর্মকর্তাদের কে ডেকে বদলির বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। সেই সাথে ডিপো ইনচার্জদের সাথে মাসিক মাসোহারার ব্যাপারে দেনদরবার করেন।
বিআরটিসির একটি সুত্র জানায়, বর্তমান চেয়ারম্যান বদলির মাধ্যমে কয়েকটি বাস ও ট্রাক ডিপো ইনচার্জদেরকে বদলি করেন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে।
অনুসন্ধানে বিআরটিসির একাধিক সুত্রে আরো জানা যায়, বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা মোটা অংকের উৎকোচ ও মাসিক মাসোহারার চুক্তিতে দুইটি বড় ধরনের বদলির আদেশ করে।
বদলির প্রথম আদেশে ম্যানেজার টেকনিক্যাল মোঃ সালাউদ্দিন রুমির কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন ও মাসিক মাসোহারা ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে প্রধান কার্যালয় থেকে যাত্রাবাড়ী বাস ডিপোতে ম্যানেজার হিসাবে বদলি করা হয়। ম্যানেজার অপারেশন মোঃ জামিল হোসেনের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন ও মাসিক মাসোহারা ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে বরিশাল বাস ডিপো থেকে টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপোতে বদলী করা হয়। উপ ব্যবস্থাপক অপারেশন মোঃ কামরুজ্জামানের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন ও মাসিক মাসোহারা ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে ময়মনসিংহ বাস ডিপো থেকে চট্টগ্রাম বাস ডিপোতে বদলী করা হয়। পরিযান কর্মকর্তা জুফিকার আলীর কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন ও মাসিক মাসোহারা ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে চট্টগ্রাম বাস ডিপো থেকে বরিশাল বাস ডিপোতে বদলী করা হয়। হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা মোঃ এনামুল হকের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন ও মাসিক মাসোহারা ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপো থেকে ময়মনসিংহ বাস ডিপোতে বদলী করা হয়।
এছাড়াও অপর আরেকটি আদেশে। সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর মোঃ মাসুদ তালুকদারের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন ও মাসিক মাসোহারা ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে ঢাকা ট্রাক ডিপো থেকে সোনাপুর বাস ডিপোতে বদলী করা হয়। স্টোর কিপার মোঃ আরিফুর রহমান তুষারের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন ও মাসিক মাসোহারা ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে সোনাপুর বাস ডিপো থেকে নারায়ণগঞ্জ বাস ডিপোতে বদলী করা হয়।
এছাড়াও ইন্সট্রাক্টর মোঃ মোশারফ হোসেন ছিদ্দিকীর কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন ও মাসিক মাসোহারা ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে কুমিল্লা বাস ডিপো থেকে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বদলী করা হয়। ম্যানেজার কারিগরি মোঃ আব্দুল কাদের জিলানীর কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন ও মাসিক মাসোহারা ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে নারায়ণগঞ্জ বাস ডিপো থেকে কুমিল্লা বাস ডিপোতে বদলী করা হয়।
এ ভাবেই উৎকোচ গ্রহন, মাসিক মাসোহারা চুক্তি আর দুর্নীতি করে বিআরটিসি কে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা।
অপরদিকে প্রতিদিন বানিজ্য মেলায় রাজস্ব অর্জিত হয়েছে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা। অথচ প্রতিদিন অফিসিয়ালী আয় দেখানো হয় ১০ থেকে ১২ লাখ। বাকী অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
এ ব্যাপারে বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার সাথে বার বার যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, আপনি অফিসে আসেন। আমরা সাক্ষাতে আলাপ করি। এই বলে তিনি ফোনটি রেখে দেন।
বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী, সড়ক ও সেতু মন্ত্রী, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী সহ বিআরটিসির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।