
* প্রতিবেদকের হাতে চাঞ্চল্যকর গোপন প্রতিবেদন। * রিজার্ভ চুরির ডিজিটাল এভিডেন্স ধ্বংসের রোমহর্ষক নথিপত্র ফাঁস। * তদন্ত গিলে খেতে একের পর এক সৎ কর্মকর্তা বলী।
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের সাবেক এডিশনাল ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খানের ‘ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য’, রিজার্ভ চুরির ফাইল জিম্মি ও শত কোটি টাকা পাচারের চাঞ্চল্যকর সংবাদ আজকের বাংলাদেশ টুয়েন্টিফোর ডটকম পত্রিকায় প্রকাশের পর খোদ অপরাধ জগতের চেয়েও বেশি কম্পন শুরু হয়েছে ‘তদবিরবাজ’ এক শ্রেণীর সাংবাদিক নেতাদের মধ্যে।
সিআইডির এই প্রভাবশালী কর্মকর্তার অপরাধের ফিরিস্তি ধামাচাপা দিতে এবং ওয়েবসাইট থেকে নিউজ নামিয়ে ফেলতে রীতিমতো ‘মিশন’ নিয়ে মাঠে নেমেছেন বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) একাধিক শীর্ষ স্থানীয় নেতা।
প্রতিবেদকের সাথে বার বার মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ এ যোগাযোগ করে সংবাদটি সরানোর জন্য নানামুখী সমঝোতার প্রস্তাব, প্রলোভন ও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন তারা।
তদবিরবাজ সাংবাদিক নেতাদের এই নির্লজ্জ দৌড়ঝাঁপের মাঝেই এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে এক বিস্ফোরক ‘গোপন প্রতিবেদন’।
এই গোপন নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কেবল ক্ষমতার অপব্যবহারই নয়, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক সাইবার হামলা—বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্তকে সুনিপুণ কৌশলে সম্পূর্ণ পঙ্গু ও অকার্যকর করে দিয়েছেন এই রায়হান উদ্দিন খান।
আন্তর্জাতিক হ্যাকার ও দেশীয় রাঘব বোয়ালদের রক্ষা করতে ডিজিটাল এভিডেন্স ধ্বংস করা থেকে শুরু করে কয়েকজন সৎ কর্মকর্তাদেরকে একের পর এক বলী দেওয়ার রোমহর্ষক অধ্যায় উঠে এসেছে এ প্রতিবেদনে।
রায়হান খানকে বাঁচাতে ক্র্যাব নেতাদের মরিয়া মিশনঃ সংবাদ প্রকাশের পর সিআইডির সাবেক ওই কর্মকর্তার থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ায় ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কায় নড়েচড়ে বসেছে তার পেছনে থাকা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সিআইডির ভেতর-বাইরের সূত্রগুলো বলছে, রায়হান উদ্দিন খানের গড়ে তোলা ‘মিডিয়া ট্রায়াল সিন্ডিকেট’-এর অন্যতম অংশীদার ক্র্যাবের কতিপয় শীর্ষ নেতা।
সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর তারা অপরাধের পক্ষে ওকালতি করতে মাঠে নামেন। সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে ওই কর্মকর্তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এবং সংবাদটি ওয়েবসাইট থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে তারা প্রতিবেদকের ওপর নানামুখী চাপ ও সমঝোতার টোপ দিচ্ছেন।
পেশাদার সাংবাদিকদের সংগঠন ক্র্যাবের নাম ভাঙিয়ে একজন চরম বিতর্কিত কর্মকর্তার পাচারের টাকা ও অপরাধ আড়াল করার এই মরিয়া চেষ্টা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
রিজার্ভ চুরির তদন্তে ‘ডিজিটাল খুনের’ রোমহর্ষক কাহিনীঃ এ প্রতিবেদকের হাতে আসা অত্যন্ত সংবেদনশীল ওই গোপন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্তে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খান যা করেছেন, তা স্রেফ গাফিলতি নয়, বরং ‘পরিকল্পিত অপরাধ’।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI), বিএই সিস্টেমস ও ক্যাসপারস্কির মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যখন অকাট্য প্রমাণসহ এই সাইবার হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার ‘লাজারাস গ্রুপ’কে দায়ী করেছে, তখন রায়হান উদ্দিন খান রহস্যজনক ভাবে সেই ডিজিটাল চেইন-অফ-কাস্টডি বজায় রাখেননি।
এছাড়া কোনো আইনি ভিত্তি বা কারিগরি লগ তিনি আদালতে উপস্থাপন করেননি, যাতে আন্তর্জাতিক অপরাধীরা আইনি ফাঁক গলে পার পেয়ে যায়।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, এত বড় মহাচুরির ঘটনায় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর বা আইটি বিভাগের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করেননি। উল্টো রাকেশ আস্তানা নামের এক বিতর্কিত ভারতীয় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞকে এনে হ্যাক হওয়া সিস্টেমে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ওই বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও আইটি লগ ‘ডিলিট’ বা মুছে ফেলার সুযোগ করে দেন রায়হান নিজেই, যার কোনো দাপ্তরিক স্বাক্ষর বা অডিট ট্রেইল রাখা হয়নি। এটি আদালতে প্রমাণ নষ্ট করার এক জঘন্য শামিল।
গো এমএল’ চ্যানেলের তথ্য পাচার ও মামলার সংখ্যা নিয়ে ভেলকিবাজিঃ প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অতি সুরক্ষিত ‘গো এমএল’ (GoAML) সিকিউর চ্যানেলের এক্সেস অপব্যবহার করে রায়হান উদ্দিন খান বিভিন্ন ব্যাংক ও ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গোপন রিপোর্ট গুলো তদন্ত শুরুর আগেই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মূল অপরাধী ব্যবসায়ী ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে পাচার করে দিতেন।
তার আমলের একটি পরিসংখ্যান দিলেই থমকে যেতে হয়—তার ইউনিটে বিপুল সংখ্যক মানিলন্ডারিং ‘অনুসন্ধান’ বা ইনকোয়ারি শুরু হলেও তার নগণ্য অংশ ‘নিয়মিত মামলা’য় রূপ নিত। অর্থাৎ, অনুসন্ধান শুরু করে ব্লাকমেইল ও দেনদরবারের মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আসামিদের ‘ক্লিনচিট’ দিয়ে ফাইল ধামাচাপা দেওয়াই ছিল তার মূল বাণিজ্য। এমনকি দুদক সম্পত্তি ক্রোক করার পরও রায়হান বেআইনিভাবে সিআইডি থেকে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়ে আসামিদের রক্ষার চেষ্টা করেছেন।
সত্য বললেই বদলিঃ মং থোয়াই মারমাসহ ৩ কর্মকর্তাকে বলী! গোপন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিকে মামলার তৃতীয় তদন্ত কর্মকর্তা মং থোয়াই মারমা সিআইডির ভেতরের এই নোংরা খেলা ধরে ফেলেন। তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার উপস্থিতিতে এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে স্পষ্ট জানান যে, রায়হান উদ্দিন খান দীর্ঘ নয় বছরে মামলাটিতে চার্জশিট দেওয়ার মতো কোনো তথ্য প্রমাণই অবশিষ্ট রাখেননি। তদন্তের মৌলিক কাজের সিংহ ভাগই ফাঁকা রাখা হয়েছে।
এই সত্য তুলে ধরার অপরাধে অদৃশ্য ইশারায় সৎ কর্মকর্তা মং থোয়াই মারমাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দায়িত্ব পান ফরহাদ কবীর। তিনিও তদন্তের ত্রুটি দেখে দ্রুত চার্জশিট দিতে আপত্তি জানালে তাকেও ছুড়ে ফেলা হয়।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রায়হান উদ্দিন খান সিআইডিতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন এবং নিজের ক্ষমতার দাপটে এ পর্যন্ত ৩ জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করিয়েছেন।
বর্তমানে মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সহকারী পুলিশ সুপার আল মামুনকে, যিনি রায়হানের হাত ধরে সিআইডিতে আসা অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও অনুগত শিষ্য হিসেবে পরিচিত। উদ্দেশ্য একটাই—একটি জোড়াতালির দায়সারা চার্জশিট দিয়ে রিজার্ভ চুরির ভেতরের রাঘববোয়ালদের চিরতরে আড়াল করা।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে বসেও বদলি-বাণিজ্য ও দুবাই-সাম্রাজ্যঃ সিআইডিতে প্রায় ১১ বছর জেঁকে বসা রায়হান উদ্দিন খান ৫ আগস্টের পর নিজেকে ‘বঞ্চিত’ সাজিয়ে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। এরপর জামায়াত-ঘনিষ্ঠ অংশ এবং খোদা বক্স চৌধুরীর নাম ভাঙিয়ে কিছুদিনের জন্য চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার হলেও সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমের নিয়ন্ত্রণ ছাড়েননি। বর্তমানে তাকে পদায়ন করা হয়েছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা ‘পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-১’-এ। এখান থেকে তিনি সারা দেশের পুলিশের পোস্টিং, বদলি ও পদোন্নতির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে।
বিতর্কিত হুইপ বকুল ও ঢাকা জেলার এসপি শামীমার বলয়ের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এখন ওপেন সিক্রেট।
এই সংবেদনশীল ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটকে ঢাল বানিয়ে মানিলন্ডারিংয়ের আসামিদের ব্ল্যাকমেইল করে রায়হান যে শত শত কোটি টাকা হাতিয়েছেন, তার বড় অংশই হুন্ডির মাধ্যমে দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। দুবাইতে তার সম্পদের পাহাড় নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ জমা পড়েছে একাধিক অভিযোগ।
শেষ রক্ষা হবে কি?ঃ সচেতন মহল ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিআইডির মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে রায়হান উদ্দিন খানের মতো বিতর্কিত কর্মকর্তা এবং ক্র্যাবের তদবিরবাজ সাংবাদিক সিন্ডিকেট মিলে যে তামাশার পাত্র বানিয়েছে, তা দেশের আর্থিক নিরাপত্তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অবিলম্বে রায়হান উদ্দিন খানকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও সিআইডির প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে, ক্র্যাব নেতাদের তদবিরের কলকাঠি খতিয়ে দেখে একটি উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি বা স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। অন্যথায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার প্রকৃত সত্য কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না, বরং অপরাধীদের পার করে দেওয়ার একটি আইনি দলিল তৈরি হবে।
এ সব বিষয়ে কথা বলতে রায়হান উদ্দিন খানের সাথে কয়েকদফা যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোন বক্তব্য বা মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে কথা বলতে বলেন।