বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ট্রান্সরেইল লাইটিং ও অমৃক সিংয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, দুদকে অভিযোগ দাখিল বাপার ইবিটি কার্যক্রমে প্রশিক্ষণ পেল ৪৬ হাজার মানুষ ক্ষমতার চরম অপব্যবহার ও জালিয়াতি : পটপরিবর্তনের পর খোলস পাল্টাতে মরিয়া শিল্পকলার শামীম আকতার বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন রাজউকের পলাশ : বললেন আমি সাধু নই দুদকের অভিযোগের পরিসমাপ্তি, মিলেছে পরিষ্কার রায় : ষড়যন্ত্রের শিকার বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমান দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন রাজউকের ইমারত পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম পিয়াল তদন্তাধীন মামলা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ গাজীপুরে এনডিইএ-এর নতুন কমিটি, আহ্বায়ক মেরাজুল ইসলাম ও সদস্য সচিব মাসনুন নাফি বিআইডব্লিউটিএ নেতা মাজহারের লম্বা হাত তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও গড়েছেন সম্পদের পাহাড় : হয়েছেন স্বঘোষিত সভাপতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়ের পর প্রেম, বিয়ে ও অর্থ আত্মসাৎ : খুলনায় নারীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ 

ট্রান্সরেইল লাইটিং ও অমৃক সিংয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, দুদকে অভিযোগ দাখিল

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ Time View

এম শিমুল খানঃ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেড ও প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

লাল মিয়া নামে এক ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদুক) এর প্রধান কার্যালয়ে এ অভিযোগটি করেন। একই সাথে তিনি প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী ও বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের সচিবের কাছেও এই অভিযোগ দাখিল করেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেড কাজের শুরু থেকেই নানা অনিয়মের কারণে প্রকল্পের বিপুল অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক ও গাছের মালিকরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও কমিশনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের কাজ পায়।

তৎকালীন আওয়ামী সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগে প্রকাশ, অনিয়ম শুধু নির্মাণকাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের কর ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।

গাছ কাটার ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্নঃ প্রকল্প এলাকার ভুক্তভোগীদের অন্যতম অভিযোগ, টাঙ্গাইল থেকে ধামরাই পর্যন্ত প্রায় ৮২ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য গাছ কাটার বিপরীতে বরাদ্দ করা অর্থের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হয়নি।

লাল মিয়া অভিযোগে আরো জানান, প্রতি কিলোমিটারে গাছ কাটার ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও অনেক জমি ও গাছের মালিক কোনো অর্থ পাননি।

তাঁদের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফুলচান, মো. নবী, সুমা আক্তার, মো. নবী, আদুরীসহ শত শত মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেছে ট্রান্সরেইল লাইটিং প্রতিষ্ঠানটি। আরও অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও জমির মালিকদের যথাযথ অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। তাঁদের দাবি, এ খাতে বরাদ্দ অর্থেরও ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে।

টাওয়ার নির্মাণের মান নিয়েও অভিযোগঃ দুদকে অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার নির্মাণের কারিগরি মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

তাঁদের অভিযোগ, টাওয়ার স্থাপনের জন্য যেখানে প্রায় ২০ ফুট গভীর পাইলিং করার কথা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ ফুটের বেশি পাইলিং করা হয়নি। একই সঙ্গে প্রয়োজনের তুলনায় কম নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো স্থানে প্রায় ২০০ বস্তা সিমেন্ট ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে ৪০ থেকে ৫০ বস্তার মতো সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। নিম্নমানের রড ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তাঁরা।

তবে পাইলিংয়ের গভীরতা, সিমেন্ট ও রডের পরিমাণসহ এসব অভিযোগ প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, বিল অব কোয়ান্টিটি (BoQ) এবং প্রকৌশলগত পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, নির্মাণকাজে কারিগরি মান বজায় না থাকলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগঃ দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগে প্রকাশ, প্রকল্পটি সরকারি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে বা ভয়ভীতি দেখিয়ে গাছ কাটা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে দাবি তাঁদের।

পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি কাজ পাওয়ায় তখন অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে তাঁরা আশাবাদী ছিলেন না।

অভিযোগের বরাতে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ট্রান্সরেইল লাইটিং এর কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা ছেড়ে ভারতে চলে যান। প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের দেশত্যাগ এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার অভিযোগঃ প্রকল্পটির কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না করার অভিযোগও করা হয় ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য সঞ্চালন অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। মূল সময় সূচি অনুযায়ী রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ২০২৩ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিটে ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কথা ছিল। ওই সঞ্চালন অবকাঠামোর অংশ হিসেবে পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ সিঙ্গেল-সার্কিট ৪০০ কেভি লাইন এবং যমুনা নদীর ওপর প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল-সার্কিট ৪০০ কেভি ও ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ২৩০ কেভি লাইন নির্মাণের জন্য ভারতীয় কোম্পানি ট্রান্সরেল লাইটিংয়ের সঙ্গে ৫২৪ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে গ্রিড লাইনের কাজ সম্পন্ন করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের মান, সময়সীমা এবং চুক্তির শর্ত যথাযথ ভাবে পালন করা হয়েছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল থেকে ধামরাই পর্যন্ত অংশের নির্মাণকাজ সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে এফ আর ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ফরিদের বিরুদ্ধেও নিম্নমানের কাজ, অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।

এ সকল অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে জাকির নামে পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তি ফোনে দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কাজটি তাদের মালিকানাধীন এফ আর ইঞ্জিনিয়ারিং বাস্তবায়ন করছে। একই ব্যক্তি কখনো নিজেকে আমার বার্তা পত্রিকার সম্পাদকের ছোট ভাই, কখনো প্রকাশক, আবার কখনো প্রকাশকের ভাই বলে পরিচয় দেন। এছাড়া তিনি একজন এমপির ভাগিনা বলেও পরিচয় দেন এবং সংবাদ প্রকাশ না করতে হুমকি দেন। তবে তার পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিঃ স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গাছ ও জমির ক্ষতিপূরণ, নির্মাণকাজের মান, প্রকল্পের অর্থব্যবস্থাপনা, কর পরিশোধ এবং কাজের সময়সীমা প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। তদন্তে অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হোক।

দুদক যা বললোঃ দুদক কর্মকর্তারা বলেন, অভিযোগগুলো গুরুতর হওয়ায় বিষয়গুলো যাচাই করে দেখা হবে। নথিপত্র, প্রকল্পের চুক্তি, অর্থ ছাড় ও ব্যয়ের হিসাব, ক্ষতিপূরণ পরিশোধ এবং নির্মাণকাজের মান পর্যালোচনা করে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্রান্সরেইল লাইটিংয়ের সাথে যোগাযোগঃ অভিযোগ গুলোর বিষয়ে ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড ও প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের বক্তব্য জানা গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (প্রশাসন) শাহরিয়ারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি স্বভাবসুলভ দায়সারা জবাবে বলেন, অমৃক সিং মিটিংয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। তার সঙ্গে আমার কথা হয়নি। যোগাযোগ হলে বিষয়টি তাকে অবশ্যই জানাব। এছাড়াও তিনি সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে দিয়ে এই প্রতিবেদককে ফোন করান।

বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো স্পর্শকাতর খাতে প্রকাশ্যে দিবালোকে এমন হরিলুট কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে পালিয়ে যাওয়া অমৃক সিং ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি উঠেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2022 agamirbangladesh24.com
Developed by: A TO Z IT HOST
Tuhin